05/02/2026
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেয়ার প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরের প্রধান তিনটি টার্মিনালের কার্যক্রম। গতকালও কনটেইনার ওঠানো-নামানো বন্ধ থাকায় জেটিতে জাহাজ আটকে আছে। নতুন করে কোনো জাহাজ ভেড়ানোও সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, চলমান কর্মবিরতির প্রভাবে গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এদিন বন্দরের ইয়ার্ড ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে মোট ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউ (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার জমে রয়েছে, যেখানে বন্দরের মোট ধারণক্ষমতা ৫৯ হাজার টিইইউ। এর মধ্যে ফুল কনটেইনার লোড (এফসিএল) রয়েছে ২৯ হাজার ৯০৪ টিইইউ, ডিপোতে ১ হাজার ৪১৮ টিইইউ, এলসিএল ১ হাজার ৩৮ টিইইউ, আইসিডিতে ১ হাজার ৭৬৯ টিইইউ, আইসিটিতে ৭০ টিইইউ, খালি কনটেইনার (এমটিওয়াই) ২ হাজার ১৭৫ টিইইউ এবং রফতানি কনটেইনার রয়েছে ৯৩৮ টিইইউ। কর্মবিরতির কারণে গত দুইদিন কোনো কনটেইনার ডেলিভারি হয়নি। ফলে কনটেইনারে পণ্য আমদানি ও রফতানিনির্ভর ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বড় ধরনের জটিলতায় পড়ায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, আন্দোলনরত নেতা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণীর স্টেকহোল্ডাররা নিজ উদ্যোগে গতকাল আলোচনায় বসলেও বন্দর কর্মীরা দাবি আদায়ে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনড় রয়েছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, গতকাল সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ নম্বরসহ সবক’টি প্রধান ফটকে পণ্যবাহী যানবাহনের কোনো তৎপরতা ছিল না। স্বাভাবিক সময়ে এ ফটক দিয়ে আমদানি ও রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনারের চলাচলের দীর্ঘ সারি থাকলেও গতকাল ফটকের দুই পাশই বন্ধ ছিল। বন্দরের ভেতরে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এলাকাও ছিল পুরোপুরি নীরব। বন্দরের অভ্যন্তরে জেটিতে থাকা ১১টি কনটেইনার জাহাজের গ্যান্ট্রি ক্রেন ও জাহাজ ক্রেন গুটিয়ে রাখা হয়। কোথাও কনটেইনার বা পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ চলেনি।
বন্দরের তথ্যমতে, এনসিটি ইজারাবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু হলেও বিকালে আন্দোলনকারীরা লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। এর আগে গত শনিবার থেকে টানা তিনদিন প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করা হয়।
শ্রমিক-কর্মচারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের পর গত প্রায় দুই দশকে বন্দরে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি আর দেখা যায়নি। তথ্যমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি—এ তিনটি টার্মিনাল দিয়েই দেশের আমদানি-রফতানি কনটেইনারের ৯৭-৯৮ শতাংশ ওঠানো-নামানো হয়। বাকিটা পরিচালিত হয় পতেঙ্গায় অবস্থিত সৌদি মালিকানাধীন আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনালে, যা ২০২৪ সাল থেকে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে পরিচালনা করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দরের অভ্যন্তরে শ্রমিকরা সক্রিয় না থাকায় কনটেইনারবাহী পণ্য পরিচালন, খালাস কাজ শূন্যে নেমেছে। আজও (বুধবার) কোনো পণ্য খালাস হয়নি। তবে বহির্নোঙরে খোলা পণ্যবাহী জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর চলছে যথারীতি।’
বন্দরের তথ্যমতে, আন্দোলনকারীদের বাধার কারণে গতকাল বন্দরের প্রধান তিন টার্মিনাল থেকে কোনো জাহাজ ছেড়ে যেতে পারেনি। সকালে জোয়ার শুরু হলেও জাহাজ আনা-নেয়ার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে জেটিতে পণ্যবাহী জাহাজ আটকে ছিল। রফতানি পণ্যবাহী কোনো কনটেইনারও বন্দরে প্রবেশ করেনি এবং আমদানি পণ্যও খালাস করা যাচ্ছে না। মূল তিন টার্মিনালে অচলাবস্থার কারণে নতুন জাহাজ ভেড়ানো বন্ধ থাকায় বন্দরের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া থেকে সরকার সরে না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। শ্রমিক-কর্মচারীরা টানা কর্মসূচি পালন করলেও সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আলোচনায় আসছে না। শুরুর দিকে আন্দোলন মিছিল ও সমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকলেও চুক্তি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছানোর পরই আমরা কঠোর কর্মসূচি নিয়েছি। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের এ আন্দোলন চলছে।’
২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটি স্থাপন ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড টার্মিনালটি পরিচালনা করছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব ধরনের টার্মিনাল মাশুল প্রতিষ্ঠানটিই আদায় করবে। প্রতি কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষকে কত ডলার দেয়া হবে,
তা নিয়ে বর্তমানে দরকষাকষি চলছে। ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে এ দরকষাকষি শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এম তানভীর বলেন, ‘রফতানি পণ্যের প্রায় পুরোটাই পাঠানো হয় কনটেইনারে। এভাবে চললে বন্দরের ভেতরে আবার কনটেইনারজট তৈরি হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, একবার জট তৈরি হলে স্বাভাবিক হতে অনেক দিন সময় লাগে। এতে পুরো সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে।’